জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

জিসিসি অঞ্চলের কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে ৩১ শতাংশ

শুধু আগের বছরের তুলনায় নয়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায়ও মুনাফা বেড়েছে কোম্পানিগুলোর।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে রেকর্ড মুনাফা করেছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসিভুক্ত দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) এসব কোম্পানির সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছে ৭ হাজার ৪৮০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। খবর আরব নিউজ।

জিসিসির ছয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান। এসব দেশের কোম্পানির দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কামকো ইনভেস্ট।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিসিসির কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ার প্রধান কারণ জ্বালানি ও ব্যাংক খাতের শক্তিশালী ফলাফল। একই সঙ্গে গড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ফলে অঞ্চলটির অপরিশোধিত তেল রফতানির পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রভাবও অনেকটা পুষিয়ে গেছে।

শুধু আগের বছরের তুলনায় নয়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায়ও মুনাফা বেড়েছে কোম্পানিগুলোর। জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এপ্রিল-জুনে জিসিসির তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা বেড়েছে ১০ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব কোম্পানির আয়ে জ্বালানি খাতের গুরুত্ব এখনো অনেক বেশি। নিজস্ব অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে জিসিসির দেশগুলো। তেলনির্ভরতা কমিয়ে সম্প্রতি পর্যটন, প্রযুক্তি, পরিবহন, রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন অনাবাসিক খাত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর পরও করপোরেট আয়ে জ্বালানি খাতের প্রভাব শক্তিশালী।

কামকো ইনভেস্টের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিসিসির তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত রাজস্ব বেড়েছে ১৭ শতাংশ। এ সময়ে মোট আয় হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি। প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) তুলনায়ও রাজস্ব বেড়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোকে হিসাবের বাইরে রাখলে জিসিসির বাকি কোম্পানিগুলোর রাজস্বও ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

সৌদি আরবের নেতৃত্ব

জিসিসির করপোরেট মুনাফা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান সৌদি আরবের। দেশটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৫৩০ কোটি ডলারে উঠেছে। গত বছরের একই সময়ে এ মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৩২০ কোটি ডলার।

সৌদি কোম্পানিগুলোর মোট মুনাফার ৯২ শতাংশ এসেছে তিনটি খাত থেকে। এগুলো হলো জ্বালানি, ব্যাংকিং ও মৌলিক উপকরণ বা ম্যাটেরিয়ালস খাত। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সৌদি আরামকো। দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ৪২ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ২৪০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির মোট আয়ও ১৯ শতাংশ বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষক টনি হলসাইড বলেন, ‘জিসিসির বাজারে মুনাফা বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি সৌদি আরব। আরামকোর মুনাফা বৃদ্ধিতে তেলের দাম বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে আরামকোকে বাদ দিলেও সৌদি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর রাজস্ব প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে।’

কুয়েত ও আমিরাতেও বেড়েছে মুনাফা

জিসিসির দেশগুলোর মধ্যে কুয়েতের কোম্পানিগুলো মুনাফায় সবচেয়ে বেশি শতাংশ প্রবৃদ্ধি করেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩১০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

আবুধাবির তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে সম্মিলিত মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৪৭০ কোটি ডলার।

এদিকে দুবাইয়ের কোম্পানির মুনাফা ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬৯০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ওমানের কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে সব দেশে মুনাফা বাড়েনি। কাতারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা ২০ শতাংশ কমে ২৯০ কোটি ডলারে নেমেছে। বাহরাইনের কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ। আর সম্মিলিত মুনাফা হয়েছে ৫৭ কোটি ডলার।

প্রথমার্ধেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) জিসিসির তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছে ১৪ হাজার ২৮১ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ মুনাফা বেড়েছে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ বা ২ হাজার ৬৮ কোটি ডলার।

প্রথমার্ধে মুনাফা বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিয়েছে সৌদি আরব ও আবুধাবি। উভয় বাজারেই মুনাফা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ওমানে মুনাফা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

জ্বালানি খাতেই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি

খাতভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে প্রবৃদ্ধিতে আছে জ্বালানি খাত। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ খাতের কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মুনাফা ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৬২ কোটি ডলারে উঠেছে।

পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মুনাফাও রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিসিসির ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এ মুনাফা ছিল ১ হাজার ৬৬ কোটি ডলার।

বাজার বিশ্লেষক টনি হলসাইডের মতে, জিসিসির সব দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। একদিকে কুয়েত, সৌদি আরব, আবুধাবি ও ওমানে দুই অংকের মুনাফা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে কাতার ও বাহরাইনে মুনাফা কমেছে।

তার মতে, এ পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশ ও খাতভিত্তিক নির্বাচনকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। ব্যাংক ও টেলিযোগাযোগ খাত এগোলেও তুলনামূলক দ্রুত বেড়েছে জ্বালানি, রিয়েল এস্টেট, ম্যাটেরিয়ালস ও পরিবহন খাত।

ফলে জিসিসির শেয়ারবাজার এখন আর শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নেই। দেশ ও খাতভেদে মুনাফার চালিকাশক্তি আলাদা হয়ে উঠছে।

আরও